চিপ খাতে অস্থিরতার প্রভাব

রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছার পর নিম্নমুখী বৈশ্বিক শেয়ারবাজার

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে গতকাল। ফলে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পর এদিন কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে স্বর্ণের দাম। জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে মূল্যবান ধাতুটির দাম। খবর দ্য এজ মালয়েশিয়া।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারের গতিবিধি অনুসরণকারী এমএসসিআই অল কান্ট্রি ওয়ার্ল্ড ইনডেক্স টানা পাঁচদিনের উত্থানের পর দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির শেয়ারে দুর্বলতার কারণে কমেছে সূচকটি। একই সঙ্গে এশিয়ার শেয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেখা গেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ও ইউরোপীয় শেয়ারের ফিউচার সামান্য বেড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল চিপ খাতের দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে এশিয়ার বাজারে। কোরিয়া ও জাপানের সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন দেখা গেছে। কোরিয়ার কসপি সূচক কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এ সূচককে এআই খাতের বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে দেখা হয়। সূচকটির পতনে বড় ভূমিকা রেখেছে মেমোরি চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ারের দরপতন। এদিকে জাপানে কিয়োক্সিয়া করপোরেশনের শেয়ারদর কমেছে ৯ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। মেমোরি চিপ নির্মাতা স্যান্ডিস্কের শেয়ারদর লেনদেনের পরবর্তী সময়ে ৮ শতাংশ কমেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়েস্টার্ন ডিজিটালের শেয়ারদর কমেছে ১২ শতাংশ। দুটি কোম্পানিই আর্থিক ফল প্রকাশের পর এমন দরপতনের মুখে পড়ে।

বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন বড় প্রশ্ন হলো, এশিয়ার মেমোরি চিপ খাতে বিনিয়োগ ধরে রাখার জন্য নতুন কী ধরনের প্রণোদনা বা ইতিবাচক কারণ সামনে আসতে পারে। অলস্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টসের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক গ্যারি ট্যান বলেন, ‘এশিয়ার মেমোরি চিপ খাতে বিনিয়োগ ধরে রাখার জন্য আরো কী ধরনের নতুন অনুঘটক প্রয়োজন, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলছেন।’

চিপ খাতের অস্থিরতার পেছনে শুধু কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফল নয়, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান তিনি। গত মাসে এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ দেখা যায়। এতে বেশ কয়েকটি হেজ ফান্ডও ক্ষতির মুখে পড়ে। এরপর কম দামে শেয়ার কেনার জন্য কিছু বিনিয়োগকারী বাজারে ফিরলে চিপ খাতে সাময়িক স্বস্তি আসে। তবে সে স্বস্তি খুব বেশি স্থায়ী হয়নি।

এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড সেমিকন্ডাক্টর ইনডেক্সের গতিবিধিতেও এ অস্থিরতা স্পষ্ট। জুনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর সূচকটি ২০ শতাংশের বেশি কমেছিল। এআই খাতে বিপুল ব্যয় কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ ও চীনের উন্নত চিপ তৈরির সক্ষমতা বাড়ার আশঙ্কা ছিল এ পতনের অন্যতম কারণ। পরে সূচকটি প্রায় ১৫ শতাংশ ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু সাম্প্রতিক দরপতন বলছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলেও বাজার এখন সে বিনিয়োগ থেকে ভবিষ্যতে কতটা আয় হবে, তা নিয়ে বেশি হিসাব করছে। অর্থাৎ শুধু এআই ব্যবসায় অর্থ ঢাললেই হবে না, সে বিনিয়োগের বিপরীতে কোম্পানিগুলো কতটা আয় ও মুনাফা করতে পারবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ কারণে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বিনিয়োগ কমিয়ে অন্য খাতে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি। যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক মঙ্গলবার রেকর্ড উচ্চতায় বন্ধ হওয়ার পর প্রযুক্তি খাত থেকে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সরে এসেছেন। এর প্রভাব এশিয়ার বাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে কোরিয়ার মতো বাজার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ দেশটির শেয়ারবাজার সূচকে দুটি বড় মেমোরি চিপ কোম্পানির প্রভাব অনেক বেশি। ফলে প্রযুক্তি খাতের নেতৃত্বে পরিবর্তন হলে কোরিয়ার বাজারে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

এদিকে বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দামও বেড়েছে। স্পট গোল্ডের দাম দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২৬৩ ডলার ৫৬ সেন্টে উঠেছে। জুনের পর এটাই স্বর্ণের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান।

স্বর্ণের দামের এ উত্থানের সঙ্গে জ্বালানি ও সুদহারের প্রত্যাশার সম্পর্ক রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ফের স্বাভাবিক হতে পারে ও তেলের দাম কমতে পারে বলে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের ওপর সুদহার বাড়ানোর চাপ কমতে পারে বলেও মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। সাধারণত সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা কমলে কোনো স্বর্ণের আকর্ষণ বাড়ে।

আরও